পাকিস্তানের বিপক্ষে সিলেট টেস্টে সেঞ্চুরি করে ব্যাট ও হেলমেট উঁচিয়ে ধরেন লিটন দাস।সেঞ্চুরির পর লিটন দাস।

ভরদুপুরেই বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে নেমে এসেছিল জমাট আঁধার। ঘাসের ছোঁয়া থাকা উইকেটে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে ধসে পড়ার মুখে স্বাগতিকদের ইনিংস। ২৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর সেই চিরচেনা ‘রাওয়ালপিন্ডি ট্র্যাজেডি’র ভূত যেন আজ তাড়া করছিল চায়ের শহর সিলেটকেও। একপর্যায়ে অন্য প্রান্তে শেষ স্বীকৃত ব্যাটার যখন আউট হলেন, বাংলাদেশের রান তখন ১১৬।

লিটন কুমার দাসের রান তখন মোটে ২। সেখান থেকেই শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ। স্কিল, শৌর্য আর মস্তিষ্কের লড়াইয়ে লিটন আরও একবার প্রমাণ করলেন, পাকিস্তানের বিপক্ষে তিনি একাই এক ‘ক্রাইসিস ম্যান’।

দাবার চাল ‘শল্যবিদের’ ব্যাটিংশৈলী

১১৬ রানে ৬ উইকেট পড়ার পর লিটনের সঙ্গী বলতে তখন শুধুই বোলাররা। এই মরণপণ লড়াইয়ে লিটনের ব্যাট কখনো হয়ে উঠল ঢাল, কখনো তলোয়ার। পাকিস্তান অধিনায়কের ফিল্ডিং সাজানো দেখে খেলাটা একপর্যায়ে রূপ নিয়েছিল দাবার বোর্ডে। লিটন স্ট্রাইকে এলেই সব ফিল্ডার ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল সীমানায়।

আরও পড়ুন:
নিজেকে বাংলাদেশের ‘সর্বকালের সেরা ক্যাপ্টেন’ বললেন লিটন দাস

কিন্তু লিটনের মাথা যেন কাজ করছিল কম্পিউটারের মতো। লোয়ার অর্ডারদের আগলে রাখা, স্ট্রাইক ধরে রাখা আর সীমানার প্রহরীদের ফাঁক গলে বাউন্ডারি বের করা—সবকিছুই তিনি করলেন একজন দক্ষ শল্যবিদের মতো সুনিপুণভাবে।

টেল-এন্ডারদের নিয়ে লিটনের প্রতিরোধ

৭ম উইকেটে (তাইজুল ইসলাম): ৬০ রান (টাইজুলের অবদান ৪০ বলে ১৬)

৮ম উইকেটে (তাসকিন আহমেদ): ৩৮ রান

৯ম উইকেটে (শরীফুল ইসলাম): ৬৪ রান

লেজের ব্যাটারদের নিয়ে খেলা ৩৮ ওভারের মধ্যে ১৬২ রানের জুটি গড়েন লিটন, যেখানে তাঁর একার অবদানই ছিল ১২৪ রান!

রিজওয়ানের জীবনদান ও ৯৯ রানের নাটকীয়তা

ব্যক্তিগত ৫২ রানে খুররম শাহজাদের বলে লিটনের গ্লাভস ছুঁয়ে বল গিয়েছিল উইকেটরক্ষক মোহাম্মদ রিজওয়ানের হাতে। কিন্তু আম্পায়ার আউট দেননি, পাকিস্তানও নেয়নি রিভিউ। সেই জীবনদানের পুরো ফায়দা তোলেন লিটন। সাজিদ খানকে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে মাথার ওপর দিয়ে আর মিড উইকেট দিয়ে সুইপ করে মারা বাউন্ডারি দুটি ছিল তাঁর ব্যাটিংয়ের সেরা বিজ্ঞাপন।

তবে টেস্ট ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ সেঞ্চুরি ছোঁয়ার আগে অপেক্ষাটা ছিল চরম নাটকীয়। লিটন যখন ৯৯ রানে, তখন অন্য প্রান্তে শরীফুল ইসলামকে এলবিডব্লিউ দিয়ে বসেন আম্পায়ার। উইকেট বাকি আর মাত্র একটি! ড্রেসিংরুমে তখন চরম উৎকণ্ঠা। তবে রিভিউ নিয়ে টিকে যান শরীফুল। ওভার শেষ হতেই আম্পায়ার দিলেন ড্রিংকস ব্রেক। অবশেষে বিরতির পর শাহজাদকে তাঁর ‘ট্রেডমার্ক’ দৃষ্টিনন্দন কাভার ড্রাইভে বাউন্ডারি মেরে তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার স্পর্শ করেন লিটন। পঙ্গপাল স্টাইলে সেঞ্চুরি উদযাপনের পরের বলেই মারেন বিশাল এক ছক্কা।

পাকিস্তান বধের ত্রয়ী রূপকথা

পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করাটা লিটনের জন্য এখন নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। লাল বলের ক্যারিয়ারে তাঁর ৬টি সেঞ্চুরির ৩টিই এসেছে এই এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, প্রতিবারই ধ্বংসস্তূপ থেকে।

১. ২০২১ (চট্টগ্রাম): ৪৯ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর মুশফিককে নিয়ে ডাবল সেঞ্চুরির জুটি।

২. ২০২৪ (রাওয়ালপিন্ডি): ২৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর ১৩৮ রানের সেই অবিশ্বাস্য উদ্ধারগাথা।

৩. ২০২৬ (সিলেট): ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারানো দলকে একাই টেনে নিলেন ১২৬ রান পর্যন্ত।

দিনের খেলা শেষে যখন মৃদু পায়ে মাঠ ছাড়ছিলেন ক্রিকেটাররা, তখন ডাগআউটের কাছে থমকে দাঁড়িয়ে লিটনের জন্য হাততালি দিচ্ছিলেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। অধিনায়কের সেই করতালিই বলে দিচ্ছিল, আজ ক্রিকেট বিশ্ব আরও একবার দেখল ‘ত্রাতা’ লিটনের ধ্রুপদি রূপকথা।

আরও পড়ুন:
অধিনায়কত্ব ও উইকেটকিপিং নিয়ে মুখ খুললেন লিটন দাস