Brazil forward Neymar smiling in the yellow jersey during meeting with Ancelotti.নেইমারকে ঘিরে বিশ্বকাপের ছক আঁকছেন আনচেলত্তি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

পথের দূরত্ব প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার। ভাষা কিংবা সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা হলেও আনন্দ আর কান্নার রঙে বাংলাদেশ ও ব্রাজিল যেন একই মোহনায় এসে মিশেছে। তবে একটা প্রশ্ন ইদানীং ফুটবলপাড়ায় বেশ জোরেসোড়েই ঘুরপাক খাচ্ছে— দল নির্বাচনে নেট দুনিয়ার ভক্ত-সমর্থকদের ঝড়ো প্রভাবের আইডিয়াটা কি ব্রাজিলিয়ানরা বাংলাদেশ থেকেই ধার করল?

বাংলাদেশ ক্রিকেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে দল বদলের গল্প নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবার ব্রাজিলের কোণে কোণে ‘নেইমারকে দলে চাই’— ভক্তদের এমন তুমুল দাবির মুখে রিও ডি জেনিরোর মিউজিয়াম অব টুমোরোতে যখন ২০২৬ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করা হচ্ছিল, তখন সান্তোস ফরোয়ার্ডের নাম আসতেই উপস্থিত সবার উচ্ছ্বাসে কান পাতা দায় হয়ে পড়েছিল। খোদ কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে থমকে যেতে হয় খানিকটা সময়।

তারকা নয়, ‘খেলোয়াড়’ নেইমারকে চান আনচেলত্তি

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, বাইরের এই গণচাপের মুখে বাধ্য হয়েই কি নেইমারকে দলে নিলেন আনচেলত্তি? উত্তর হলো— না। নেইমারের বিশ্বমানের প্রতিভা নিয়ে ইতালিয়ান কোচের মনে কোনো সন্দেহ না থাকলেও, মূল দুশ্চিন্তা ছিল ফিটনেস। কিন্তু সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে আনচেলত্তির পুরো কোচিং স্টাফের মন গলিয়েই দলে জায়গা করে নিয়েছেন এই পোস্টার বয়।

ফুটবল পণ্ডিতদের মতে, বিশ্বকাপ জেতার জন্য যে ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ প্রয়োজন, ব্রাজিলের জন্য নেইমার ঠিক তাই। বার্সেলোনা তারকা রাফিনিয়ার ভাষায়, ‘এই ছেলেটাই আমাদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ এনে দেবে।’

আরও পড়ুন:
যে ভিডিও কলে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে নেইমার!

তবে গুরু আনচেলত্তি সস্তা তারকাখ্যাতিতে বিশ্বাসী নন। দল ঘোষণার সময় তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর দলে কোনো বিশেষ তারকার জায়গা নেই; তিনি চান শুধুই একজন খেলোয়াড়। দলের বাকি ২৫ জন যেমন, নেইমারও ঠিক তাই। তিনি নেইমারকে ৫ মিনিট, ১০ মিনিট কিংবা পুরো ৯০ মিনিট খেলাতে পারেন, আবার মাঠের বাইরেও বসিয়ে রাখতে পারেন।

আর এখানেই লুকিয়ে আছে ইতালিয়ান কোচের আসল নাটুকে মাস্টারপ্ল্যান!

নেইমারকে ঘিরেই আনচেলত্তির বিশ্বকাপ ছক

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে জাতীয় দলের বাইরে থাকা এবং আনচেলত্তির অধীনে কোনো ম্যাচ না খেলা নেইমার কীভাবে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে মানিয়ে নেবেন, তা নিয়ে সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মাঠ এবং মাঠের বাইরে ভিনিসিয়ুস, রাফিনিয়া, কাসেমিরো কিংবা ব্রুনো গিমারেসের মতো পুরনো সৈনিকদের সঙ্গে নেইমারের বোঝাপড়া দীর্ঘদিনের।

আক্রমণভাগের যেকোনো পজিশনে খেলতে পারদর্শী এই ফরোয়ার্ডকে ঘিরেই মূলত এবার তুরুপের তাস সাজাচ্ছেন ব্রাজিল বস। নেইমার নিজেও গোল করার চেয়ে গোল করাতে ভালোবাসেন। আনচেলত্তি ঠিক এই প্রিয় দিকটিকেই কাজে লাগিয়ে নেইমারকে খেলাবেন নিখুঁত একজন ‘প্লে-মেকার’ হিসেবে।

তবে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুসারে, আনচেলত্তি বহুদিন ধরেই নেইমারকে ঘিরে বিশ্বকাপের নাটুকে ছক আঁকছেন। নেইমারের ফিটনেস ঠিক করতে নানা সময়ে নানা বক্তব্য দিয়ে তাঁকে চাপে রাখা হয়েছে। কিন্তু নেইমার আসলে দলের পরিকল্পনাতেই ছিলেন।

আনচেলত্তি এমন রহস্যময় ছক বানাচ্ছেন, যা তাঁর সীমিত গণ্ডির বাইরে আর কারো সাথে শেয়ার করছেন না। আর এই ছকের মূলে রয়েছেন নেইমার।

‘জোগো বোনিতো’র প্রত্যাবর্তন

বিগত বিশ্বকাপগুলোতে ব্রাজিলের ব্যর্থতার প্রধান কারণ ছিল মাঝমাঠের তীব্র সৃজনশীলতার অভাব। আনচেলত্তির দলেও এই দুর্বলতা স্পষ্ট। নেইমারকে মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের মেলবন্ধনের প্রধান মাধ্যম বানিয়ে সেই খরা কাটাতে চান কোচ।

নেইমারের জাদুকরী পা যখন বলের নিয়ন্ত্রণ নেবে, তখন দলে গতি ও সৃজনশীলতা দুই-ই বাড়বে।

আর তাতেই দীর্ঘদিন পর ব্রাজিলের চিরাচরিত সাম্বা ফুটবল বা ‘জোগো বোনিতো’ পুনর্জন্ম পাবে বিশ্বমঞ্চে। প্রত্যাশার এমন পর্বতসমান চাপ মাথায় নিয়েই নেইমার এবার নামছেন ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের মিশনে, যার ট্রেলার ইতিমধ্যেই বিশ্ববাসী দেখে নিয়েছে দল ঘোষণার নাটুকে মুহূর্তে।

আরও পড়ুন:
পেলে, রোনালদোদের অভিজাত রেকর্ডে নেইমার!