আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপে হেক্সা বা ষষ্ঠ শিরোপার খোঁজে নামার আগে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের আগমনী বার্তাটা রাজকীয়ভাবেই দিয়ে রাখল ব্রাজিল। রিও ডি জেনেইরোর ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে পানামাকে ৬-২ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে কার্লো আনচেলত্তির দল। গুনে গুনে প্রতিপক্ষের জালে ৬ গোল দিয়ে সেলেসাওরা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল—বিশ্বকাপে তারা নিজেদের উজাড় করে খেলতে আসছে, মাঠে জানপ্রাণ দিয়ে লড়বে এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে বিন্দুমাত্র দয়া দেখাবে না। ভিন্ন ভিন্ন ৬ জন খেলোয়াড়ের—ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, কাসেমিরো, রায়ান, লুকাস পাকেতা, ইগর থিয়াগো ও দানিলোর গোল উৎসবের দিনে ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের প্রত্যাশার পারদ এখন তুঙ্গে।
ম্যাচের শুরু থেকেই অতি-আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজায় ব্রাজিল। মাত্র দ্বিতীয় মিনিটেই ভিনিসিয়ুসের চমৎকার গোলে লিড পায় স্বাগতিকরা।
তবে ১৪ মিনিটে খেলার ধারার বিপরীতে এক ধাক্কা খায় তারা; পানামার মাইকেল মুরিলোর একটি ফ্রি-কিক ব্রাজিলের ম্যাথিউস কুনহার গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়ালে ১-১ গোলে সমতা ফেরে। ধাক্কা সামলে প্রথমার্ধের শেষ দিকে ভিনির ক্রস থেকে অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার কাসেমিরোর দুর্দান্ত হেডে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় ব্রাজিল। প্রথমার্ধে মূলত ৪-২-৪ ফরমেশনে খেলানোয় দুই মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমেনেস ও কাসেমিরোকে বেশ চাপে থাকতে হয়েছিল, উইঙ্গারদের বাতাসে ভাসানো আক্রমণগুলোও দানা বাঁধেনি।
বিরতির পর ১০ বদল ও আনচেলত্তির ‘মধুর সমস্যা’
দ্বিতীয়ার্ধে যেন এক অন্য রুদ্রমূর্তি ধারণ করে ব্রাজিল। হাফটাইমে একসঙ্গে ১০ জন খেলোয়াড় পরিবর্তন করে ফরমেশন ৪-৩-৩-এ রূপান্তর করেন আনচেলত্তি।
মাঝমাঠে ফ্যাবিনিওর সঙ্গে লুকাস পাকেতা ও দানিলোর রসায়নে ম্যাচের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয় সেলেসাওরা। বিরতির পর শুরু হয় আসল টর্নেডো।
৫৩ মিনিটে প্রতিপক্ষ ডিফেন্সের ভুলের সুযোগ নিয়ে গোল করেন বোর্নমাউথ ফরোয়ার্ড রায়ান। ৬০ মিনিটে পাকেতার শট ডিফ্লেক্টেড হয়ে জালে জড়ায়।
এরপর ৬৩ মিনিটে ঠান্ডা মাথার ফিনিশে পেনাল্টি থেকে পঞ্চম গোলটি করেন ইগর থিয়াগো। ৮১ মিনিটে প্রতিপক্ষ বক্সে চোখধাঁধানো এক টার্ন নিয়ে ব্রাজিলের হয়ে শেষ পেরেকটি ঠোকেন ডিফেন্ডার দানিলো। মাঝে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে পানামার কার্লোস হার্ভি একটি গোল শোধ করলেও তা শুধু ব্যবধানই কমিয়েছে। ম্যাচে ব্রাজিলের মোট শট ছিল ১৪টি।
দুই অর্ধে দুই রকম ফুটবল ও দ্বিতীয়ার্ধের ৪ গোলের এই দাপট নিয়ে ম্যাচ শেষে কোচ আনচেলত্তি বলেন, “দলের এই পারফরম্যান্স আমার মাথায় সংশয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এটি দলের জন্য ভালো, কারণ সুস্থ প্রতিযোগিতা ও এমন ‘ইতিবাচক সংশয়’ বা মধুর সমস্যা থাকাটা জরুরি।”
বিশেষ করে পাকেতার মান, গোল ও অ্যাসিস্টের ভূয়সী প্রশংসা করেন এই ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড।
বিশ্বকাপে রহস্য-রোমাঞ্চ চান আনচেলত্তি
বিশ্বকাপের প্রধান কৌশল কি তাহলে এই ৪-৩-৩ ফরমেশনই হতে যাচ্ছে?
সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে স্বভাবসুলভ রসিকতায় আনচেলত্তি বলেন, “বিশ্বকাপের আগপর্যন্ত আমি কিছুটা রহস্য আর রোমাঞ্চ বজায় রাখতে চাই। তা না হলে আমাদের কথা বলার মতো কোনো বিষয়ই থাকবে না! এটা আপনাদের (সাংবাদিকদের) জন্যও সহায়ক হবে; কারণ নেইমারের (দলে জায়গা পাওয়ার) বিষয়টি তো এখন শেষ। আমাদের এখন যা করতে হবে, তা হলো আলোচনা করার মতো একটা ভালো টপিক বা বিষয় তৈরি করা, যাতে মানুষের আগ্রহ ও কৌতূহল বজায় থাকে।”
এদিকে মাঠে আসা নেইমারকে পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানায়। ফিট না হওয়ায় তিনি এই ম্যাচ খেলেননি।
পানামা বধের মিশন শেষে আগামী ৭ জুন মিশরের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। এরপর ১৪ জুন মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে আসল বিশ্বকাপ যাত্রা। গ্রুপ পর্বে ২০ জুন হাইতি এবং ২৫ জুন স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হবে সেলেসাওরা।
ম্যাচ শেষে সোমবার সকাল পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে কাটানোর ছুটি শেষে বিকেলে পুরো দল যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা হবে।
সেখানে দলের সঙ্গে যোগ দেবেন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল খেলা মার্কিনহোস, গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েস ও গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিরা।

