মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই বিশ্বমঞ্চে এক অদ্ভুত সমীকরণ আর মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে পড়ে গেল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সের আকস্মিক হার এবং স্পেনের পয়েন্ট হারানোর সুবাদে আন্তর্জাতিক ফুটবলের রিয়াল-টাইম ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান ফিরে পেয়েছে লিওনেল মেসির দল। তবে এই সুখবরের পিঠেই লুকিয়ে আছে এক চরম অস্বস্তি ও আশঙ্কার কালো মেঘ। ফুটবল বিশ্বে গত তিন দশক ধরে প্রচলিত ‘ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের অভিশাপ’ এখন তাড়া করছে আলবিসেলেস্তেদের। ইতিহাস বলছে, র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল হিসেবে যে দেশই বিশ্বকাপে পা রেখেছে, আজ পর্যন্ত কেউ সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে পারেনি!
ফরাসিদের পতন, সিংহাসনে আর্জেন্টিনা
ফিফার নতুন তাৎক্ষণিক (রিয়েল-টাইম) আপডেট পদ্ধতি অনুযায়ী, ম্যাচের গোলের ওপর ভিত্তি করে পয়েন্ট নির্ধারিত হয়। গত রাতে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচে আইভরি কোস্টের কাছে ফ্রান্স ২-১ গোলে হেরে যাওয়ায় শীর্ষস্থান থেকে দুই ধাপ নিচে নেমে তিন নম্বরে চলে গেছে দিদিয়ের দেশমের দল। অন্যদিকে ইরাকের সাথে ১-১ গোলে স্পেন ড্র করায় আর্জেন্টিনা দুই ধাপ লাফিয়ে ফের বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে আরোহণ করেছে।
বর্তমানে ১৮৭৪.৮১ পয়েন্ট নিয়ে সবার ওপরে আর্জেন্টিনা।
১৮৭৩.০১ পয়েন্ট নিয়ে স্পেন দ্বিতীয় এবং ১৮৬৯.৪৩ পয়েন্ট নিয়ে ফ্রান্স রয়েছে তৃতীয় স্থানে। এরপর যথাক্রমে ইংল্যান্ড (৪র্থ), পর্তুগাল (৫ম) এবং ব্রাজিল (৬ষ্ঠ) অবস্থানে রয়েছে। আগামী ১০ জুন বিশ্বকাপ শুরুর আগের দিন ফিফা অফিশিয়ালি এই র্যাঙ্কিং হালনাগাদ করবে।
তার আগে আগামী রোববার সকাল ৬টায় হন্ডুরাস এবং বুধবার সকাল সাড়ে ৬টায় আইসল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে আর্জেন্টিনা।
আরও পড়ুন:
বিশ্বকাপে মেসির টানে সাইকেলে ১৭ হাজার কিলোমিটার পাড়ি!
৩২ বছরের সেই চেনা ‘ফিফা অভিশাপ’
১৯৯২ সালে ফিফা র্যাঙ্কিং প্রথা চালু করার পর থেকে এ পর্যন্ত আটটি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কোনোবারই এক নম্বর দল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি।
ফুটবল আর কুসংস্কারকে ভীষণ গুরুত্ব দেওয়া আর্জেন্টিনার জন্য এটি এক বড় মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা।
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক সেই অভিশপ্ত ইতিহাস:
১৯৯৪ বিশ্বকাপ: শীর্ষ দল জার্মানি কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়, চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল।
১৯৯৮ বিশ্বকাপ: এক নম্বর দল ব্রাজিল ফাইনালে স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে হেরে যায়।
২০০২ বিশ্বকাপ: শীর্ষ দল ফ্রান্স একটি গোলও করতে না পেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়!
২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপ: দুবারই এক নম্বর দল হিসেবে খেলতে নেমে কোয়ার্টার ফাইনালে স্তব্ধ হয় ব্রাজিল।
২০১৪ বিশ্বকাপ: ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ও এক নম্বর দল স্পেন গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে যায়।
২০১৮ বিশ্বকাপ: শীর্ষ দল জার্মানিকে গ্রুপ পর্বেই বিদায়ের লজ্জা পেতে হয়।
২০২২ বিশ্বকাপ: র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরে থাকা ব্রাজিল বিদায় নেয় কোয়ার্টার ফাইনালে। আর তিনে থাকা আর্জেন্টিনা হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন।
৬০ বছরের পুরোনো আরও এক ভূত
শুধু র্যাঙ্কিংয়ের অভিশাপই নয়, উত্তর আমেরিকার এই মেগা বিশ্বকাপে লিওনেল স্কালোনির দলকে লড়তে হবে ইতিহাসের আরও এক কঠিন দেওয়ালের বিরুদ্ধে।
১৯৬২ সালে পেলের ব্রাজিলের পর গত ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো দেশ টানা দুইবার (ব্যাক-টু-ব্যাক) বিশ্বকাপ জিততে পারেনি।
১৯৭০ সালের পর আর্জেন্টিনা (১৯৯০), ব্রাজিল (১৯৯৮) এবং ফ্রান্স (২০২২) চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরের আসরের ফাইনালে উঠলেও রানার্স-আপ হয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছিল।
মেসি ও তাঁর দলের সামনে এখন দুটি পথ খোলা—হন্ডুরাস বা আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে পয়েন্ট হারিয়ে র্যাঙ্কিংয়ের নিচে নেমে যাওয়া, অথবা ৩২ বছরের এই ‘ফিফা অভিশাপ’ ও ৬০ বছরের ব্যাক-টু-ব্যাক ট্রফি না জেতার মিথ ভেঙে ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন মহাকাব্য রচনা করা।

