ঘরোয়া ক্রিকেটে অমিত হাসানের ব্যাটিং।বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ের নতুন তারকা হতে পারেন অমিত হাসান।

২২ গজের তপ্ত রোদে যখন প্যাড-ব্যাট পরে একজন তরুণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন তাঁর প্রতিটি শট কেবল রানের সংখ্যা বাড়ায় না, বরং গড়ে তোলে একটি দীর্ঘ অপেক্ষার মহাকাব্য। সেই মহাকাব্যের নাম অমিত হাসান। ঘরোয়া ক্রিকেটের সবুজ গালিচায় যিনি গত কয়েক বছর ধরে রানের আলপনা এঁকে চলেছেন, অবশেষে তাঁর জন্য খুলল জাতীয় দলের সেই আরাধ্য সাদা পোশাকের দরজা।

অপেক্ষা যখন প্রাপ্তির অলঙ্কার

২০১৯ সাল। কিশোর থেকে যুবক হওয়ার সন্ধিক্ষণে অমিতের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক। সেই থেকে শুরু এক অন্তহীন পথচলা। ৪৯টি ম্যাচে প্রায় ৫০ গড়ে ৩,৬৫০ রান—এই পরিসংখ্যানটুকু কেবল সংখ্যা নয়, বরং তাঁর ঘাম আর সংকল্পের দলিল।

১১টি সেঞ্চুরি আর ১৭টি ফিফটির প্রতিটি ইনিংসে অমিত লিখেছেন তাঁর ধৈর্যের পরীক্ষা। জাতীয় দলের দুয়ারে কড়া নেড়েছেন বারবার, কিন্তু সুযোগ যেন মরীচিকা হয়ে ধরা দিচ্ছিল। অবশেষে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের দলে তাঁর নাম আসতেই পুরো দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে এখন খুশির সুবাতাস।

মুশফিক: আদর্শ যখন সতীর্থ

প্রতিটি মানুষের মনে একজন ধ্রুবতারা থাকে। অমিতের সেই ধ্রুবতারা আর কেউ নন, খোদ ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ মুশফিকুর রহিম। ছোটবেলায় যাঁর কিপিং আর ব্যাটিং দেখে অমিত স্বপ্ন বুনতেন ক্রিকেটার হওয়ার, আজ সেই আইডলের সাথে ড্রেসিংরুম শেয়ার করার সুযোগ তাঁর সামনে।

অমিত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “যাঁকে দেখে ক্রিকেট শুরু করেছি, ঘরোয়া ক্রিকেটে যাঁর পাশে ব্যাটিং করেছি, এখন সেই মুশফিক ভাইয়ের সাথে জাতীয় দলে খেলাটা গর্বের। এটা এক প্রকার স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো।”

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ টেস্ট দলে চমক তানজিদ ও অমিত, ফিরলেন তাসকিন-শরীফুল

নারায়ণগঞ্জের ছেলে যখন সিলেটের ‘ঘরের ছেলে’

অমিতের জন্ম ও বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জে হলেও তাঁর ক্রিকেটীয় আত্মপ্রকাশ সিলেটের চা-বাগানের স্নিগ্ধতায়। গত ৬-৭ বছর ধরে সিলেটের হয়ে খেলতে খেলতে তিনি আজ ওখানকার মাটির সন্তান হয়ে গেছেন। কোচ রাজিন সালেহ আর আব্দুল হান্নানের হাত ধরে তাঁর ক্রিকেটের ভিত শক্ত হয়েছে।

রাজিন সালেহর অভিজ্ঞতা আর অমিতের একাগ্রতা—দুটো মিলে তৈরি হয়েছে এক নিখুঁত ব্যাটসম্যান। অমিত কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন তাঁর সেই কোচদের, যাঁদের হাত ধরে আজকের এই ‘অমিত’ হয়ে ওঠা।

ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক: বল বাই বলের দর্শন

আধুনিক ক্রিকেটে যখন গতির ঝড়, তখন অমিত বিশ্বাস করেন স্থৈর্য আর শৃঙ্খলায়। নির্বাচক হাবিবুল বাশার অমিতের যে গুণটিতে মুগ্ধ হয়েছেন, তা হলো তাঁর ‘টেম্পারমেন্ট’। বড় বড় ডাবল সেঞ্চুরি কিংবা পাহাড়সম রান করার পেছনে অমিতের দর্শনটা খুব সাধারণ—“আমি লম্বা চিন্তা করি না, শুধু বল বাই বল খেলার চেষ্টা করি।”

বর্তমানে থাকার এই অদম্য স্পৃহা তাঁকে আরও পরিণত করেছে। উইকেটকিপিংটাও তাঁর প্যাশন, যদিও দলের প্রয়োজনে ফিল্ডিংয়েও সমান স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এই তরুণ।

স্বপ্ন যখন লম্বা রেসের ঘোড়া হওয়া

জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া মানেই শেষ নয়, বরং এক নতুন যুদ্ধের শুরু। অমিত জানেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জ কতটুকু। তবে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছেন তিলে তিলে। স্বপ্ন দেখেন দেশের জন্য লম্বা রেসের ঘোড়া হওয়ার।

২২ গজের সাদা ক্যানভাসে অমিত যখন তাঁর প্রথম টেস্ট রানটি করবেন, তখন সেটি কেবল একটি রান হবে না; সেটি হবে দীর্ঘ এক অপেক্ষার সফল সমাপ্তি এবং এক নতুন নক্ষত্রের উদয়।

অমিত সম্ভাবনার এই অমিত হাসান কি পারবেন তাঁর নামের সার্থকতা প্রমাণ করতে? তাঁর ধৈর্য আর ব্যাট সেই উত্তর দেবে খুব শীঘ্রই।