আর মাত্র তিন মাস। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মাটিতে গড়াবে ফুটবলের মহোৎসব—২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নামবে আর্জেন্টিনা। কিন্তু মাঠের লড়াই শুরুর আগেই এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। কাতার বিশ্বকাপে সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পর দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর কেটে গেলেও একটিও ইউরোপীয় দেশের মুখোমুখি না হয়েই আগামী বিশ্বকাপে মাঠে নামতে যাচ্ছে আলবিসেলেস্তেরা।
ফিনালিসিমা বাতিল: হাতছাড়া হলো শেষ সুযোগ
ফুটবল ভক্তদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ছিল আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার ‘ফিনালিসিমা’ নিয়ে। কোপা আমেরিকা ও ইউরো জয়ী দুই মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নের এই লড়াই হওয়ার কথা ছিল কাতার ফুটবল ফেস্টিভালের অংশ হিসেবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নতুন সূচি নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে গেছে।
সান্তিয়াগো বার্নাব্যু কিংবা লিসবনের মতো ভেন্যু নিয়ে আলোচনা হলেও আলোর মুখ দেখেনি এই মেগা ইভেন্ট। ফলে স্পেনের মতো পাওয়ারহাউসের বিপক্ষে নিজেদের শক্তি যাচাইয়ের শেষ সুযোগটিও হারালেন লিওনেল মেসিরা।
ইতিহাস বনাম বর্তমান: এক অদ্ভুত পরিসংখ্যান
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। ১৯৮২ বিশ্বকাপের আগে লুইস মেনোত্তির অধীনে আর্জেন্টিনা ২২টি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিল, যার বড় অংশই ছিল শক্তিশালী ইউরোপীয় প্রতিপক্ষ। অথচ ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে স্কালোনির খেরোখাতায় কোনো ইউরোপীয় দেশের নাম নেই।
কাতার বিশ্বকাপের আগে ২০১৯ সালে জার্মানির সঙ্গে ২-২ ড্র এবং ২০২২ ফিনালিসিমায় ইতালিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর থেকে ইউরোপীয় ফুটবলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার বিচ্ছেদ ঘটেছে।
বাণিজ্যিক লাভ বনাম টেকনিক্যাল প্রস্তুতি
গত কয়েক বছরে আর্জেন্টিনার ম্যাচ নির্বাচনের ধরনে একটি সুনির্দিষ্ট ‘বাণিজ্যিক কৌশল’ লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন তকমা এবং লিওনেল মেসির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) তুলনামূলক দুর্বল দলের বিপক্ষে ম্যাচ খেলাকে প্রাধান্য দিয়েছে।
কুরাসাও, ইন্দোনেশিয়া, এল সালভাদর কিংবা অ্যাঙ্গোলার মতো দলের বিপক্ষে খেলে মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে আর্থিক মুনাফাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। বিশ্বকাপের ঠিক আগে ৩১ মার্চ ঘরের মাঠে গুয়াতেমালার বিপক্ষে খেলবে আর্জেন্টিনা, যা হবে ঘরের মাঠে মেসিদের শেষ ম্যাচ।
৩৯-এর মেসি ও স্কালোনির চিন্তা
বিশ্বকাপ চলাকালীন লিওনেল মেসির বয়স হবে ৩৯ বছর। ষষ্ঠ বিশ্বকাপে ফুটবল জাদুকরকে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। মেসি নিজে বলছেন তিনি দিন গুনে এগোচ্ছেন, তবে বাস্তবতা বুঝেই সিদ্ধান্ত নেবেন। এদিকে কোচ স্কালোনি খেলোয়াড়দের ফিটনেস নিয়ে চিন্তিত। মার্চ উইন্ডো পার হওয়ার পরই চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করবেন তিনি। স্কালোনির মতে, বিশ্বকাপের আগে সেরা ছন্দে থাকা এবং কিছুটা ভাগ্যের সহায়তা পাওয়া অপরিহার্য।
বিশ্বকাপের সূচি: আলজেরিয়া থেকে যাত্রা শুরু
আগামী ১১ জুন বিশ্বকাপের পর্দা উঠলেও আর্জেন্টিনার মিশন শুরু হবে ১৬ জুন। কানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শিরোপা ধরে রাখার লড়াই শুরু করবেন মেসি-আলভারেজরা। এরপর ২২ জুন অস্ট্রিয়া এবং ২৭ জুন জর্ডানের মুখোমুখি হবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।
ইউরোপীয় কোনো বড় শক্তির বিপক্ষে না খেলেই সরাসরি বিশ্বকাপে নামা আর্জেন্টিনার জন্য ‘শাপে বর’ হয় নাকি ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে লাতিন আমেরিকার বাছাইপর্বে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা স্কালোনির দল কিউবার মতো বাধা পেরিয়ে আবারও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।

