spinner Nasum Ahmed

“খেলা ছেড়ে দিলে আমার কি হবে!”

পেরিয়ে এসেছেন ক্যারিয়ারের ১৩ বছর। কিন্তু নতুন কিছু করা, নতুন তাড়না এখনো কাজ করে নাসুম আহমেদের মধ্যে। অভিযোগের বদলে নিজেকে শাণিত করার দিকেই তার মনোযোগ।

বাঁহাতি এই স্পিনার ১৪৭তম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে এসে প্রথমবারের মতো ৫ উইকেট শিকার করেছেন। বিপিএলের এই পারফরম্যান্সের পর নিজের বোলিং, ব্যাটিং, নতুন কিছু করা, জীবনদর্শন সব নিয়ে কথা বলেছেন সিলেটের ছেলে নাসুম…

প্রশ্ন: টি-টোয়েন্টিতে প্রথম ৫ উইকেট পেয়েছেন। সঙ্গে নতুন কিছু করার আনন্দও তো বোধ হয় আছে…

নাসুম আহমেদ: হ্যাঁ, আসলে অনেক দিন ধরে অনুশীলনে ইনসুইং করানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ম্যাচে কখনো করা হয়নি, আত্মবিশ্বাস পাচ্ছিলাম না। তিন-চার মাস অনুশীলনে ভালো হচ্ছিল দেখে ম্যাচেও করলাম। এখনো যে শতভাগ ঠিকঠাক করতে পারছি, তা না। বলটা একটু ওপরে পড়ে যাচ্ছে। ওই বলটা যদি আরেকটু পেছনে পড়ে, ওটা অনেক ভালো এবং কার্যকর হবে। অনেক দিন ধরে খেলছি, ব্যাটসম্যানরা আমাকে পড়ে ফেলেছে, ওই চিন্তা থেকেই এটা চেষ্টা করছিলাম।

প্রশ্ন: বিপিএলে কী কন্ডিশন দেখে এটা অ্যাপ্লাই করলেন?

নাসুম: না, যে কেউ যদি এক্সট্রা একটা জিনিস শিখতে পারে, ওর জন্যই বেনিফিট। যেমন আমাকে আপনি এতোদিন ধরে রিড করছেন একরকম করে, এখন গিয়ে দেখতেছেন আমি আরেকরকম বল করে ফেলছি, এটা আপনার জন্য প্রবলেম হবে।

প্রশ্ন: ক্যারিয়ারের ১৩ বছর পর এসেও আপনি নতুন কিছুর চেষ্টা করছেন?

নাসুম: হ্যাঁ, আমি যখন প্র্যাকটিস করি বা রুমে যখন শুয়ে থাকি, আমার বিছানায় একটা বল থাকে। আমি সেটা ধরে চেষ্টা করি হাতের মধ্যেই। হাতের রিস্টের মধ্যেই চেষ্টা করি এই বলটা কিভাবে ছাড়া যায়। টিভিতে আমি লেফট আর্ম স্পিনারদের বোলিং দেখি। ও আসলে কী করছে, ওই সময় থেকেই ওই রকমভাবে বল ধরার চেষ্টা করি। তবে বডির কোনো কিছু পরিবর্তন করি না। যা করার এই রিস্ট দিয়ে মানে আঙ্গুল দিয়েই করার চেষ্টা করি।

প্রশ্ন: মুশতাক আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশের স্পিনাররা উইকেট থেকে এতো সাহায্য পান যে আর আলাদা করে টার্ন করানোর চেষ্টা করেন না। এটা কি সত্যি?

নাসুম: চেষ্টা যে করি না, তা নয়। বৈচিত্র্য ছাড়া তো টিকতে পারব না। একই রকম বল করে সব সময় পার পাওয়া যাবে না। একই জিনিস যদি বারবারই করি, সবাই আমাকে পড়ে ফেলবে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে আলাদা কিছু জিনিস নিয়ে আসতেই হবে। পাঁচ উইকেট পেয়েছি দেখে হয়তো সবাই ইনসুইং বলটা খেয়াল করেছে। আমি সব সময় চেষ্টা করি নতুন কিছু করতে।

প্রশ্ন: অনুশীলনেও সব সময় কিছু না কিছু করতেই থাকেন…

নাসুম: একটা কথা বলি, ধরুন এক মাসের একটা সফর শেষ করে এলাম। খুব পরিকল্পনা করি যে এক সপ্তাহ কোথাও বের হব না, কোনো কাজ করবো না। শুধু খাওয়াদাওয়া, ঘুমানো আর বিশ্রাম। কিন্তু একটা রাত পার হলেই মনে হয়, যাই একটু দৌড়ে আসি। এইটা সহজাতভাবেই হয়ে যায়। অনেকবার সংকল্প করেছি যে এবার বিশ্রাম নেব, কিন্তু পারি না। অশান্তি লাগতে শুরু করে। মাঝেমধ্যে ভাবি, যখন খেলা ছেড়ে দেব, তখন আমার কী হবে!

প্রশ্ন: এই তাড়না না থাকলে তো বোধ হয় জাতীয় দলেও আসতে পারতেন না। কী বলেন?

নাসুম: তৃতীয় বিভাগ বাছাই দিয়ে ঢাকা লিগে খেলা শুরু করেছি সেই ২০০৭–০৮ সালে, জাতীয় দলে আসি ২০২১ সালে। আমার একটা জিনিস হলো, হাল ছাড়ি না, নিজেকে সব সময় প্রস্তুত রাখার জন্য সর্বোচ্চটা দিই। অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপ খেলে যখন এলাম, প্রথম বিভাগ খেলতে নেমেছিলাম ইচ্ছা করেই।

কারণ, আমার মনে হয়েছে তখনো আমি লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটের জন্য তৈরি নই। তো যেবার প্রথম বিভাগে খেলি, ৩৬টা উইকেট পেয়েছি, ৪০০–এর বেশি রান করেছি। পরে অনেক ভুগেছি, কিন্তু হাল ছাড়িনি। এ জন্যই হয়তো সব ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে জাতীয় দল পর্যন্ত এসেছি।

প্রশ্ন: শুরুর দিকে আপনাকে মনে করা হতো একটু রক্ষণাত্মক বোলার। সেটাও কি বদলানোর চেষ্টা করছেন?

নাসুম: এটা আমি দলের প্রয়োজনেই করি। কোন বোলার চায় না উইকেট নিতে! যদি উইকেট না পাই, আমারই ক্ষতি। কিন্তু আমার ক্ষতি হয়েও যদি দলের লাভ হয়, আমি তাতে খুশি। অনেক দিন হলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছি। এখন বুঝি, আমাকে কখন উইকেট বের করতে হবে, কখন রান আটকাতে হবে। রান কম দাও, উইকেট নাও, এই কথা কারও এসে বলা লাগে না। আমি নিজেই বুঝি।

বোলিংয়ে আসার আগেই চিন্তা করি, এখানে এই ওভারে রানটা আটকাতে হবে, এই ওভারে আমার একটা উইকেট বের করতে হবে। আগে শুধু বুঝতাম যে রান আটকালেই মনে হয় দলকে সাহায্য করা হয়, এখন বুঝি যে কখনো কখনো একটা উইকেট বের করে দিলেও দলের সাহায্য হয়। দলের ভরসাটাও এ জন্যই বেড়েছে।

প্রশ্ন: দেশে এত বাঁহাতি স্পিনার, কখনো কখনো পারফর্ম করেও হয়তো সুযোগ মেলে না। নিজেকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখেন কিভাবে?

নাসুম: আমি কাউকে দেখে যদি মনে করি আমার এর থেকে আরেকটু এই করতে হবে, ওই করতে হবে। আমি কখনো তার মতো হতে পারবো না। তাকে নিয়ে চিন্তা করা যখন আমি ছেড়ে দেব, আমার লাইফ এমনিই পরিবর্তন হয়ে যাবে। আপনাকে যখন থেকে আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা বাদ দিয়ে দেব, তখন থেকে আমার সবকিছু চেঞ্জ হয়ে যাবে।

আপনাকে নিয়ে যখন আমি অভিযোগ করা ছেড়ে দেব, তখন থেকে আমার সবকিছু বদলে যাবে। অভিযোগ করাটা যখন একটা মানুষ ছেড়ে দেবে, তখনই ওর লাইফে টার্নিং পয়েন্টটা শুরু হয়ে যাবে। আমি কাউকে নিয়ে কোনো অভিযোগ করতে চাই না।

প্রশ্ন: ব্যাটিংটা নিয়ে একটু বলুন….কী ভাবেন ব্যাটিং নিয়ে?

নাসুম: সবাই আমাকে চেনে বোলার হিসেবে, মূল দায়িত্বও বোলিংয়েই। এখন যদি আমি আমার ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দেই আমার এদিকে (বোলিং) সমস্যা হয়ে যাবে। হ্যাঁ, ঠিক আছে। মনোযোগ দেব না যে তা না, এটা দলের জন্য প্রয়োজন, ১০-১৫-২০ রান প্রয়োজন। তো এটা আমি করতে পারি আলহামদুলিল্লাহ। হ্যাঁ, এটার জন্য আমি আলাদাভাবে এক্সট্রা কাজ করি যাতে ওই কাজটা আমি যাতে করতে পারি।

প্রশ্ন: শেষ দিকের ব্যাটিং নিয়ে আপনাদের বোলারদের মধ্যেও কি আলোচনা হয়?

নাসুম: হ্যাঁ, প্রচুর হয়। আমরা যদি ১০ রান করে করি, পাঁচ রান করে করে টিমের জন্য। যখন আমার দল করলো ১৪০ রান আমরা দুইজন মিলে করলাম ১০ রান। ১৫০ কিন্তু হয়ে যাচ্ছে। বা ৫০ করলে ১৮০-১৯০ কিন্তু হয়ে যাচ্ছে। এরকম করলে অনেকটা আগায়া যাবে, লাস্টের যে তিন-চারজন থাকে। তবে আমি কিন্তু একটা জায়গায় ডেঞ্জারাস ভাই, সময় পেলে কিন্তু বিপক্ষ টিমের জন্য ভয়ঙ্কর আমি।

প্রশ্ন: সামনে বিশ্বকাপ খেলতে যাবেন। অধিনায়কের সঙ্গে কোন কথা হয়েছে?

নাসুম: বিশ্বাস রাখতেছে। বাট আপ এন্ড ডাউন আছে। ভেতরে এতো বুঝা যায় না। তবে বাইরেও অনেক কথা বলে, অনেক বুঝায় তো মাশা আল্লাহ।