বাংলাদেশের ফুটবল যখন এক নতুন ভোরের সন্ধানে, তখন জাতীয় দলের প্রধান কোচের হটসিট নিয়ে চলছে টানটান উত্তেজনা। বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের দেওয়া ১৫ মে’র ডেডলাইন দোরগোড়ায়, কিন্তু কোচ চূড়ান্ত করার পথে এখন প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘অর্থ’। আলোচনায় থাকা হাইপ্রোফাইল নামগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ওয়েস্ট হ্যাম ও ওয়েলস জাতীয় দলের সাবেক কোচ ক্রিস কোলম্যান। গ্যারেথ বেলদের ইউরোর সেমিফাইনালে তোলা এই মাস্টারমাইন্ড বাংলাদেশে কাজ করতে আগ্রহী হলেও, প্রশ্ন উঠেছে—আর্থিক সীমাবদ্ধতা আর দেশের বর্তমান ফুটবল বাস্তবতায় কোলম্যান কতটা যৌক্তিক?
আর্থিক সক্ষমতা বনাম কোলম্যানের আকাশচুম্বী চাহিদা
ক্রিস কোলম্যানকে বাংলাদেশে আনা মানেই বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এক লাফে অনেকখানি বেড়ে যাওয়া। কিন্তু এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার মূল্যটাও বেশ চড়া। কোলম্যান তাঁর পুরো কোচিং স্টাফসহ প্রতি মাসে প্রায় ৩৫ হাজার ডলার (৫০ লাখ টাকার বেশি) পারিশ্রমিক চেয়েছেন। যেখানে বাফুফে নিজে জোগান দিতে সক্ষম বড়জোর ১৫-২০ হাজার ডলার।
বাকি অর্থের জন্য বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের মুখাপেক্ষী।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি মাত্র খাতের পেছনে প্রতি মাসে এত বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় করা কি সমীচীন? ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা অন্যান্য পিছিয়ে পড়া ফেডারেশনগুলোর কথা মাথায় রাখলে এই ব্যয় কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে নীতি নির্ধারকদের মধ্যে সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক।
আরও পড়ুন:
১৫ মের মধ্যেই হামজাদের নতুন কোচের সঙ্গে চুক্তি: তাবিথ আউয়াল
অবকাঠামো সংকট ও কোচের কার্যকারিতা
বাফুফের জাতীয় দল কমিটির সভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে—বাংলাদেশের ফুটবলের বর্তমান যে অবকাঠামো, তাতে কোলম্যানের মতো কোচ এসে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবেন? দেশের মাঠগুলোর নাজুক অবস্থা, বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের ফুটবলের স্থবিরতা এবং মানসম্মত পাইপলাইনের অভাব যেখানে স্পষ্ট, সেখানে শুধু ডাগআউটে একজন বিশ্বমানের কোচ বসিয়ে রাতারাতি ফলাফল পাওয়া অসম্ভব।
অনেকের মতে, ভিত নড়বড়ে রেখে ওপরের তলায় কোটি কোটি টাকা ঢালাটা হবে এক ধরণের ‘বিলাসিতা’।
কোলম্যানের মতো কোচরা দীর্ঘমেয়াদে কাজ করতে চাইলে যে ধরণের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন, তা দেওয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন।
প্রতিযোগিতার অভাব ও অর্থের অপচয়
চলতি বছরের ক্যালেন্ডার বলছে, আগামী এক বছর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ছাড়া বাংলাদেশের সামনে বড় কোনো আন্তর্জাতিক আসর নেই। এমনকি সেই সাফ-ও পিছিয়ে নভেম্বর-ডিসেম্বরে যাওয়ার বা বাতিলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, যদি সাফ-ই না থাকে, তবে প্রতি মাসে ৬০-৭০ লাখ টাকা ব্যয় করে এত বড় কোচিং স্টাফ বসিয়ে রাখার যৌক্তিকতা কোথায়? আন্তর্জাতিক ম্যাচের ব্যস্ততা ছাড়া এই উচ্চমূল্যের কোচিং প্যানেল অলস সময় কাটালে তা হবে অর্থের চূড়ান্ত অপচয়।
বিকল্প ভাবনায় ব্রেন্ড স্টর্ক ও টমাস ডুলি
কোলম্যানের বিষয়ে শেষ পর্যন্ত জট না খুললে বাফুফের সংক্ষিপ্ত তালিকায় আছেন বার্নড স্টর্ক ও টমাস ডুলির মতো অভিজ্ঞ কোচরা। টমাস ডুলি গায়ানার দায়িত্ব ছেড়েছেন সম্প্রতি, যা তাঁকে আলোচনার দৌড়ে কিছুটা টিকিয়ে রেখেছে। যদিও তালিকায় তিনি কোলম্যানের চেয়ে পিছিয়ে আছেন।
তবে কম বাজেটে ভালো কোচ পাওয়া গেলে সেটি বাফুফে এবং ক্রীড়া মন্ত্রণালয় উভয়ের জন্যই স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
ক্রিস কোলম্যান নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য একটি ‘বিগ ড্রিম’। তাঁর আগমন দেশের ফুটবলে পেশাদারিত্বের নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
তবে মাঠের সুযোগ-সুবিধা এবং পাইপলাইন শক্তিশালী না করে শুধু কোচের পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালা হবে এক ধরণের ‘শর্টকাট’ খোঁজার চেষ্টা। ফুটবলের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য এই বিশাল অর্থ কোচিং স্টাফের পাশাপাশি তৃণমূলের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে কি না, তা এখন বড় সিদ্ধান্ত।
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশ দলের কোচের পদে ‘আইনস্টাইন’সহ ১২৮ জনের আবেদন!

