২০২২ সালে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে লিওনেল মেসির সেই পরম আরাধ্য বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার দৃশ্য আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে তরতাজা। অনেক ক্যাজুয়াল দর্শক আছেন, যারা সেই ফাইনালের পর হয়তো ফুটবলে আর সেভাবে নিয়মিত চোখ রাখেননি। চার বছর পর আবারও যখন আমেরিকার মাটিতে দরজায় কড়া নাড়ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে—এই মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্ব ফুটবলে কী কী ঘটে গেল? গত কয়েক বছরে ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে ঘটে গেছে বিশাল সব ওলটপালট, ট্রফি জয় আর দলবদলের অবিশ্বাস্য সব নাটক। বিশ্বমঞ্চের মহারণ উপভোগ করার আগে মেসি ও নেইমারসহ ফুটবল বিশ্বের সেইসব বড় পরিবর্তনের গল্পগুলো একনজরে জেনে নেওয়া যাক।
মায়ামিতে মেসির রাজত্ব ও অষ্টম ব্যালন ডি’অর
কাতার বিশ্বকাপের পর পিএসজির পাঠ চুকিয়ে ৩৬ বছর বয়সে লিওনেল মেসি পাড়ি জমান আমেরিকার মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে। সেখানে গিয়েও তাঁর চিরচেনা জাদু অব্যাহত রয়েছে। মায়ামির হয়ে ১০৪ ম্যাচে ৯০ গোল করে ক্লাবটিকে তাদের ইতিহাসের প্রথম তিনটি বড় শিরোপা জেতান মেসি—লিগস কাপ (২০২৩), সাপোর্টার্স শিল্ড (২০২৪) এবং সর্বশেষ এমএলএস কাপ (২০২৫)।
আর কাতার বিশ্বকাপের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের সুবাদে নিজের অষ্টম ব্যালন ডি’অরটিও ঘরে তোলেন এই খুদে জাদুকর।
আরও পড়ুন:
রেকর্ডের এভারেস্টে লিওনেল মেসির যত অর্জন
এমবাপ্পের রিয়াল ট্র্যাজেডি ও পিএসজি ইউরোপ সেরা
২০২৪ সালের জুনে দীর্ঘ নাটকের অবসান ঘটিয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদে। দুই মৌসুমে ১০৩ ম্যাচে ৮৬ গোল করলেও রিয়ালের জার্সিতে এখনো কোনো বড় ট্রফির মুখ দেখেননি এই ফরাসি ফরোয়ার্ড, যা স্প্যানিশ জায়ান্টদের জন্য বড় ধাক্কা।
অন্যদিকে এক চরম নাটকীয়তায়, মেসি-নেইমার-এমবাপ্পের মতো মহাতারকাদের বিদায় করে তরুণদের নিয়ে গড়া দল নিয়ে পিএসজি গত মৌসুমে জিতেছিল তাদের ইতিহাসের প্রথম উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ।
এমনকি গেল শনিবার অনুষ্ঠিত ২০২৫-২৬ মৌসুমের ফাইনালে আর্সেনালকে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপাও ধরে রেখেছে তারা।
ফুটবল বিশ্বে নতুন দুই ব্যালন ডি’অর জয়ী
২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্যালণ ডি’অরে মেসি-রোনালদোর যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, তাতে অবশেষে নতুন হাওয়া লেগেছে।
২০২৪ সালে ম্যানচেস্টার সিটির স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রি জিতে নেন এই বহু কাঙ্ক্ষিত পুরস্কার। যদিও সেবার আলোচনায় ছিলেন রিয়াল ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস।
এদিকে, ২০২৫ সালে পিএসজির ফরাসি ফরোয়ার্ড উসমান দেম্বেলে জিতেছেন ফুটবলের এই সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত পুরস্কার।
কেইনের অভিশাপ মুক্তি ও লেভারকুসেনের রূপকথা
টটেনহ্যামের হয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর কোনো ট্রফি না পাওয়া ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন ২০২৩ সালে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দিয়ে বাজিমাৎ করেছেন।
বায়ার্নের হয়ে ১৪৭ ম্যাচে ১৪৬ গোল করার পাশাপাশি জিতেছেন দুটি বুন্দেসলিগাসহ ক্যারিয়ারের প্রথম চারটি ট্রফি।
অন্যদিকে জার্মানিতে জাবি আলোনসোর বায়ার লেভারকুসেন পুরো মৌসুম অপরাজিত থেকে বুন্দেসলিগা জিতে ইতিহাস গড়েছে, যা বায়ার্নের টানা ১১ বছরের রাজত্বের অবসান ঘটায়।
ইয়ামালের উত্থান ও রোনালদোর ১০০০ গোলের লক্ষ্য
ফুটবল বিশ্ব যখন মেসির উত্তরসূরি খুঁজছিল, ঠিক তখনই বার্সেলোনার লা মাসিয়া থেকে উদয় হয় লামিনে ইয়ামালের। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই বার্সার হয়ে ৩টি লা লিগা এবং স্পেনের হয়ে উয়েফা ইউরো ২০২৪ জিতেছেন এই রাইট উইঙ্গার।
তবে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে তাঁর খেলা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
অন্যদিকে, ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সৌদি আরবের আল নাসরকে লিগ শিরোপা জেতানোর পর এখন পাখির চোখ করেছেন ক্যারিয়ারের ১০০০তম গোলের দিকে। বিশ্বকাপে নামার আগে তাঁর গোলসংখ্যা এখন ৯৭৩।
আরও পড়ুন:
বিশ্বকাপের বিস্ময়-২: স্পেনের ডানা ঈশ্বরপ্রদত্ত উপহার লামিনে ইয়ামাল
আর্সেনাল চ্যাম্পিয়ন ও ইউনাইটেড-টটেনহ্যামের ধস
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে দীর্ঘ ২২ বছরের খরা কাটিয়ে অবশেষে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মিকেল আর্তেতার আর্সেনাল।
ম্যানচেস্টার সিটির টানা আধিপত্য ভেঙে ২০২৫-২৬ মৌসুমের লিগ টাইটেল নিজেদের করে নিয়েছে গানার্সরা। অপরদিকে, টটেনহ্যাম ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে যথাক্রমে ১৭ ও ১৫ নম্বরে শেষ করে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় দেখেছে। তবে ইউনাইটেড পরে রুবেন আমোরিমকে সরিয়ে মাইকেল ক্যারিককে কোচ করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
নেইমারের চোটের ধাক্কা ও থ্রি-লায়নসদের ব্যর্থতা
মেসি-রোনালদোরা ছন্দে থাকলেও ইনজুরির কারণে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন ব্রাজিলের নেইমার জুনিয়র। গত চার বছরে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে খেলেছেন মাত্র ৬৩ ম্যাচ।
বর্তমানে সান্তোসে খেলা এই তারকা ২০২৬ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে ডাক পেলেও নতুন চোটের কারণে তাঁর খেলা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
এদিকে ইংল্যান্ডের পুরুষ দল উয়েফা ইউরো ২০২৪-এর ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে ট্রফির খরা ৬০ বছরে নিয়ে ঠেকিয়েছে। তবে সারিনা উইগম্যানের অধীনে ইংল্যান্ডের নারী দল ২০২২ সালের পর ২০২৫ সালেও জিতেছে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা।
আরও পড়ুন:
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ নেইমার, রহস্যময় ছক বানাচ্ছেন আনচেলত্তি

