দুই মৌসুম, ২১টি নকআউট লড়াই এবং ২১টিতেই জয়! ইউরোপা লিগ এবং কনফারেন্স লিগে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের (ইপিএল) ক্লাবগুলোর এমন একচেটিয়া আধিপত্য এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়। এই দীর্ঘ সময়ে ইংলিশ ক্লাবগুলো মাত্র দুটি ম্যাচে হেরেছে, তবে সেটিও অন্য কোনো ইংলিশ ক্লাবের কাছেই। মাঝারি সারির ইউরোপীয় দলগুলোর বিপক্ষে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর এই অবিশ্বাস্য সাফল্য কি কেবলই তাদের সুসময়ের গল্প? নাকি এটি ইঙ্গিত করছে যে, ইপিএলের কাড়ি কাড়ি টাকার সামনে ইউরোপের বাকি লিগের ক্লাবগুলো এখন স্রেফ অসহায়?
একটা সময় ছিল যখন ইউরোপীয় ফুটবল নির্দিষ্ট চক্রে আবর্তিত হতো। আশির দশকের শুরুতে ইংল্যান্ড, নব্বইয়ের দশকে ইতালি কিংবা ২০১০-এর দশকে স্প্যানিশ ক্লাবগুলোর দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রিমিয়ার লিগের দলগুলোর জন্য ইউরোপের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির টুর্নামেন্টগুলো এখন বড্ড সহজ হয়ে গেছে।
কিন্তু যখনই চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রসঙ্গ আসে, চিত্রটা ঠিক উল্টো হয়ে যায়। ঘরোয়া ফুটবলের কোটি কোটি টাকা দিয়ে যারা ইউরোপা ও কনফারেন্স লিগে প্রতিপক্ষকে পিষে ফেলছে, তারাই চ্যাম্পিয়নস লিগের বড় মঞ্চে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছে।
ডেলয়েট মানি লিগে ইংলিশ ক্লাবের জয়জয়কার
১৫ বছর আগে স্প্যানিশ লা লিগা যখন ইউরোপীয় ফুটবলে রাজত্ব করছিল, তখন বিশ্বজুড়ে তাদের ফুটবল শৈলী ও ট্যাকটিক্সের প্রশংসা হতো।
তবে বর্তমান সময়ে প্রিমিয়ার লিগের দলগুলোর এই সাফল্যকে অনেকে কিছুটা বাঁকা চোখে দেখেন। এর বড় কারণ লিগের বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। বিশাল সম্প্রচার স্বত্বের কল্যাণে ইপিএলের ক্লাবগুলোর আয় বাকিদের তুলনায় অনেক বেশি। কেবল আন্তর্জাতিক টেলিভিশন স্বত্ব থেকেই প্রতি মৌসুমে এই লিগ ১.৩৭ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি আয় করে, যা ইউরোপের বাকি শীর্ষ চার লিগের (লা লিগা, সিরি এ, বুন্দেসলিগা ও লিগ ওয়ান) সম্মিলিত আয়ের সমান।
আরও পড়ুন:
শীর্ষ ৫ লিগ: যারা গেল চ্যাম্পিয়নস লিগে, যারা আছে ইউরোপায়
সম্প্রতি প্রকাশিত ২০২৬ ডেলয়েট মানি লিগের (Deloitte Money League) শীর্ষ চারে কোনো ইংলিশ ক্লাব নেই। রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ এবং পিএসজি প্রথম চারটি স্থান দখল করে রেখেছে।
তবে শীর্ষ ৩০টি ক্লাবের তালিকা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে একক আধিপত্য প্রিমিয়ার লিগের।
লিভারপুল, ম্যানচেস্টার সিটি, আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও টটেনহ্যাম রয়েছে শীর্ষ ১০-এর মধ্যে। এমনকি ইপিএলের ২০টি ক্লাবের মধ্যে ১৫টিই রয়েছে এই ধনী ক্লাবের তালিকায়। ১১ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়াম নিয়েও বোর্নমাউথ ২৬তম এবং ব্রেন্টফোর্ড রয়েছে ৩০তম স্থানে। প্রতি বছর বাকি লিগগুলোর সাথে ইপিএলের এই আয়ের ব্যবধান কেবলই বাড়ছে।
বৈষম্যের শিকার ইউরোপের বাকি ক্লাবগুলো
ক্রিস্টাল প্যালেসের বার্ষিক আয় ১৯৭ মিলিয়ন পাউন্ড, যা তাদের কনফারেন্স লিগের ফাইনাল প্রতিপক্ষ রায়ো ভায়েকানোর (৫২ মিলিয়ন পাউন্ড) চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি। ফলে ফাইনালে তাদের ১-০ গোলের জয় কোনো বিস্ময় নয়। ফুটবল অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ কিরণ ম্যাগুইয়ারের মতে, ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় স্তরের দল লিডস বা বার্নলির আয়ও রায়ো ভায়েকানোর চেয়ে বেশি। একইভাবে চেলসি বা অ্যাস্টন ভিলা যখন ইউরোপের এই টুর্নামেন্টগুলোতে খেলে, তখন তাদের স্কোয়াডের খরচের ধারেকাছেও বাকি দলগুলো থাকতে পারে না।
ইউরোপা ও কনফারেন্স লিগে টাকার জোরে দাপট দেখালেও চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে ধনী ক্লাবগুলোর কাছেই ধরাশায়ী হচ্ছে ইংলিশ দলগুলো।
গত দুই মৌসুমে ইংল্যান্ডের ৯টি ক্লাবের মধ্যে ৮টিই বিদায় নিয়েছে দেলোয়াত মানি লিগের শীর্ষ চার পরাশক্তির কাছে হেরে। চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটি, নিউক্যাসল এবং লিভারপুল চলতি মৌসুমে ইউরোপের মূল মঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছে সামগ্রিক ২৫-৬ গোলের বিশাল ব্যবধানে।
একমাত্র আর্সেনাল এবার ফাইনালে পৌঁছালেও শিরোপা জিততে তাদের লড়তে হবে শীর্ষ চার ধনীর অন্যতম ক্লাব পিএসজির বিরুদ্ধে।
খেলোয়াড়দের প্রথম পছন্দ এখন ইংল্যান্ড
অর্থনৈতিক এই বিশাল পার্থক্যের কারণে ইউরোপের দলবদল প্রক্রিয়াতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ইতালির মিলান বা স্পেনের কোনো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে যাওয়ার চেয়ে লাতিন আমেরিকার উদীয়মান তারকারা এখন বোর্নমাউথ, ব্রাইটন বা ব্রেন্টফোর্ডের মতো মাঝারি সারির ইংলিশ ক্লাবগুলোকে বেছে নিচ্ছেন।
কারণ এই ক্লাবগুলো যে বেতনের প্রস্তাব দিতে পারছে, তা ইউরোপের অন্য লিগের প্রতিষ্ঠিত ক্লাবগুলোর পক্ষেও দেওয়া অসম্ভব।
আগামী মৌসুমে ইউরোপা ও কনফারেন্স লিগে এসি মিলান বা বায়ার লেভারকুসেনের মতো দলগুলো থাকলেও, ব্রাইটনের মতো ধনী ইংলিশ ক্লাবগুলোই ফেবারিট হিসেবে মাঠে নামবে। তবে কোটি কোটি টাকার এই প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়নস লিগের রাজত্ব কবে পুনরুদ্ধার করতে পারবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
আরও পড়ুন:
চেলসি সংকটে: চ্যাম্পিয়নস লিগ শেষ, রেকর্ড হার ও উয়েফার নিষেধাজ্ঞা

