২০০৩ সালের এক তপ্ত দুপুর। বার্সেলোনার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার আগে বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের জন্য এক বিদায়ী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদিনহো। সেই অনুষ্ঠানে সাম্বা ব্যান্ডের মিউজিশিয়ান হিসেবে কাজ করছিলেন এক ব্যক্তি, যার সাথে এসেছিল তার সাত বছর বয়সী ছেলে। সেই ছোট্ট ছেলেটিই আজকের বার্সেলোনা ও ব্রাজিল দলের অন্যতম কাণ্ডারি— রাফিনিয়া।
গোল ডটকমকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে রাফিনিয়া শুনিয়েছেন তাঁর শৈশব, বার্সেলোনায় টিকে থাকার লড়াই এবং ব্যালন ডি’অর নিয়ে তাঁর স্পষ্ট অবস্থানের কথা।
রোনালদিনহোর উত্তরসূরি: আজীবনের বন্ধন
রাফিনিয়া এবং রোনালদিনহো একই এলাকার সন্তান। শৈশবের সেই পার্টিতে রোনালদিনহো রাফিনিয়াকে কোলে নিয়ে ঘুরেছেন কি না—তা নিয়ে এখন অনেক মুখরোচক গল্প শোনা যায়। তবে রাফিনিয়া জানিয়েছেন, সেই শুরু থেকেই রোনালদিনহো তাঁর আইডল।
২০ বছর পর আজ রাফিনিয়াও সেই একই ক্লাবে (Barcelona) খেলছেন এবং একই রকম চাপের মোকাবিলা করছেন। রাফিনিয়া বলেন, “আমি সবসময়ই সর্বোচ্চ স্তরে খেলতে চেয়েছি। শৈশব থেকেই আমি নিজেকে এই প্রচণ্ড চাপের জন্য প্রস্তুত করেছি।”
আরও পড়ুন: রাফিনিয়া-ইয়ামালের গোলে বার্সার বছর শেষের জয়
ব্রাজিলের ‘হারানো প্রজন্ম’ ও বিশ্বকাপের দায়ভার
২০০২ সালে যখন Brazil সর্বশেষ বিশ্বকাপ জেতে, রাফিনিয়ার বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। এরপর থেকে ব্রাজিল ফুটবলে আক্রমণভাগের প্রতিভার অভাব না থাকলেও বড় টুর্নামেন্টে তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৪ সালের সেই ৭-১ গোলের ধাক্কা আজও কাটেনি।
হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে বর্তমানে মাঠের বাইরে থাকা রাফিনিয়া মনে করেন, দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারাটাই এখন সেলেসাওদের বড় সংকট।
তঁর মতে, “ফুটবল মূলত ফলাফলের ওপর নির্ভর করে। যখন কোনো দল দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না, তখন মানুষ মনে করতে শুরু করে যে এটি আর আগের সেই জাতীয় দল নেই।”
হান্সি ফ্লিক: ক্যারিয়ারের রূপকার
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাফিনিয়ার বার্সেলোনা ক্যারিয়ার এক কঠিন মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ক্লাবের আর্থিক অনটন এবং লামিনে ইয়ামালের উত্থানে রাফিনিয়া ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আর্সেনাল কিংবা সৌদি প্রো লিগ ছিল তাঁর সম্ভাব্য গন্তব্য। কিন্তু দৃশ্যপটে হান্সি ফ্লিকের আগমন সবকিছু বদলে দেয়।
রাফিনিয়া জানান, “আমি বার্সেলোনা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম এবং নতুন জায়গা খুঁজছিলাম। কিন্তু হান্সি ফ্লিকই আমার ওপর আস্থা রেখেছিলেন। তিনি আমাকে জাপটে ধরেছিলেন এবং তিনিই আমার ক্যারিয়ার বদলে দিয়েছেন।”
জাভি হার্নান্দেজ রাফিনিয়াকে একজন ‘ব্যাকআপ’ বা বহুমুখী খেলোয়াড় হিসেবে দেখতেন। কিন্তু ফ্লিক তাঁকে নম্বর ১০ পজিশন বা বাম উইংয়ে খেলিয়ে তাঁর ভেতরের বারুদ বের করে আনেন। রবার্ট লেভানডোভস্কি এবং Lamine Yamal-এর কাজের চাপ নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে রাফিনিয়া গত মৌসুমে সব মিলিয়ে ৫৯টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন।
আরও পড়ুন: ৯৬ বছরের রেকর্ড ব্রেক: বিশ্বকাপে থেকেও নেই ব্রাজিল!
ব্যালন ডি’অর বিতর্ক: ‘আমিই যোগ্য ছিলাম’
২০২৪-২৫ মৌসুমে বার্সেলোনার লা লিগা ও কোপা দেল রে জয়ে রাফিনিয়ার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। কিন্তু ব্যালন ডি’অর ভোটাভুটিতে তিনি পঞ্চম স্থানে শেষ করেন। যেখানে লামিনে ইয়ামাল দ্বিতীয় এবং উসমান দেম্বেলে বিজয়ী হন। এ নিয়ে রাফিনিয়া নিজের ক্ষোভ বা আক্ষেপ লুকাতে চাননি।
তিনি বলেন, “আমার মতে, পুরো সিজন বিবেচনা করলে আমিই এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য ছিলাম। র্যাঙ্কিংটা হওয়া উচিত ছিল এমন— আমি প্রথম, লামিনে ইয়ামাল দ্বিতীয় এবং পেদ্রি তৃতীয়। এরপর চতুর্থ স্থানে থাকতেন Dembele।”
রোনালদিনহোর পার্টির সেই ছোট্ট বালক আজ বিশ্ব ফুটবলের বড় বিজ্ঞাপন। মাঠের লড়াকু ফুটবলার থেকে তিনি আজ গ্লোবাল স্টারে পরিণত হয়েছেন। ইনজুরি কাটিয়ে মে মাসে ফিরেই তিনি চান বার্সেলোনা ও ব্রাজিলকে আবার শিরোপার স্বাদ দিতে।

