জামাল ভূঁইয়া, হামজা চৌধুরী কিংবা শমিত সোম—প্রবাসী ফুটবলারদের হাত ধরে বাংলাদেশ ফুটবলে পরিবর্তনের যে হাওয়া লেগেছে, তাতে যোগ হলো এক নতুন ও রোমাঞ্চকর নাম। তিনি ট্রেভর ইসলাম। আমেরিকার বিশ্ববিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির এই মেধাবী ফরোয়ার্ডকে লাল-সবুজের জার্সিতে ভেড়ানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে। বাফুফে সহ-সভাপতি ফাহাদ করিমের সাম্প্রতিক ঘোষণায় এখন দেশের ফুটবল মহলে একটাই প্রশ্ন—কে এই ট্রেভর ইসলাম? কেন তিনি আগ্রহের কেন্দ্রে?
মেধা ও ফুটবলের অনন্য সংমিশ্রণ
২১ বছর বয়সী ট্রেভর ইসলাম কেবল একজন ফুটবলারই নন, তিনি একজন তুখোড় মেধাবী ছাত্রও বটে। বর্তমানে তিনি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন। মাঠের লড়াইয়ে তিনি সেখানকার ইউনিভার্সিটি দলের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এনসিএএ ডিভিশন-১ (D-1) লিগে নিয়মিত খেলছেন।
মূলত সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে খেললেও, লেফট ও রাইট উইঙ্গার হিসেবেও তিনি সমান পারদর্শী। তাঁর এই বহুমুখী প্রতিভা এবং বিদেশের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আক্রমণভাগের ‘গোলক্ষুধা’ মেটাতে দারুণ কার্যকর হতে পারে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ দলের কোচের পদে ‘আইনস্টাইন’সহ ১২৮ জনের আবেদন!
যেভাবে শুরু হলো এই যাত্রা
ট্রেভরের জাতীয় দলে আসার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল গত বছরের ১২ ডিসেম্বর। জাতীয় দলের বর্তমান সদস্য জায়োন আহমেদের বাবা শরীফ আহমেদের মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু হয় ফাহাদ করিমের সাথে। গত কয়েকমাসে এই প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়েছে।
১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬: ট্রেভরের জন্মনিবন্ধনের কাজ সম্পন্ন হয়।
মে, ২০২৬: আশা করা হচ্ছে এই সময়ের মধ্যে তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট হাতে আসবে।
বায়োমেট্রিক: লস অ্যাঞ্জেলেসের বাংলাদেশ কনস্যুলেট অফিসে তাঁর বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের পাইপলাইনে আরও ৬ প্রবাসী ফুটবলার!
সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারে সফলতা
৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার ট্রেভর ইসলাম ২০২৪ সালের ২৮ মে একজন ‘ওয়াক-অন’ (Walk-on) খেলোয়াড় হিসেবে স্ট্যানফোর্ড কার্ডিনাল দলে যোগ দেন।
ট্রেভর আমেরিকার টামালপাইস (Tamalpais) হাইস্কুলের ছাত্র ছিলেন। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত টানা দুইবার স্কুল ফুটবল দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০২৩ সালে তিনি ‘মেরিন কাউন্টি অ্যাথলেটিক লিগ প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন। সেই মৌসুমে ২১ ম্যাচে ২১টি গোল করে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন ট্রেভর।
২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তিনি মেরিন এফসি (Marin FC)-এর হয়ে খেলেছেন এবং ২০২২ সালে ‘সার্ফ কাপ’ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
ব্যক্তিগত জীবন
বাংলাদেশি সেলিম ইসলাম ও আমেরিকান কারেন হাওয়ারের সন্তান ট্রেভর ইসলাম। তাঁর দুই বোন রয়েছেন—কেন্ডাল ও কোর্টনি। মেধাবী এই ফুটবলার বর্তমানে ফিজিক্স (Physics) নিয়ে পড়াশোনা করছেন।
ফুটবল ছাড়াও ট্রেভরের শখের তালিকায় রয়েছে ট্রেইল রানিং, রুবিকস কিউব মেলানো, ওয়েট লিফটিং এবং কোডিং (Coding)।
মাঠে দেখতে কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?
পাসপোর্ট পেলেই যে ট্রেভর মাঠে নামছেন, বিষয়টি তেমন নয়। একাডেমিক ব্যস্ততা এবং স্ট্যানফোর্ডের এনসিএএ লিগের প্রতি প্রতিশ্রুতির কারণে ২০২৬ সালের মার্চ বা জুন উইন্ডোতে তাঁকে পাওয়া যাচ্ছে না।
ফাহাদ করিমের মতে, ২০২৬ সালের নভেম্বরের উইন্ডো নিয়ে কিছুটা আশা থাকলেও ট্রেভরকে নিয়মিত বাংলাদেশের জার্সিতে দেখার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ২০২৭ সাল থেকে।
বাফুফের এই সহ-সভাপতি বলেন, “আমরা তাঁর ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করতে চাই না। তাঁর নথিপত্র আমরা রেডি করে রাখছি যাতে তিনি প্রস্তুত হওয়া মাত্রই স্কোয়াডে যোগ দিতে পারেন।”
আরও পড়ুন: পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে বাংলাদেশের গোলপোস্টের ‘বাজপাখি’ মাহিন
ট্রেভরের এই ‘প্রলিফিক’ ফরোয়ার্ড সত্তা বর্তমান দলের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে বলে ফুটবল বোদ্ধারা মনে করছেন। স্ট্যানফোর্ডের মতো উচ্চমানের লিগে খেলার অভিজ্ঞতা মাঠে প্রতিফলিত হলে, ২০২৭ সালে বাংলাদেশের আক্রমণভাগ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভক্তদের।

